প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 28, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Oct 1, 2026 ইং
দাম ও শর্তের ফাঁদে সরকারি গুদাম থেকে মুখ ফিরিয়েছেন কৃষক
নাটোর প্রতিনিধি: মাঠে গমের আবাদ হচ্ছে, উৎপাদনও হচ্ছে বিপুল পরিমাণে। প্রতি মৌসুমে সরকারি গুদামে গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হচ্ছে। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে চলছে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, সভা-সেমিনার ও নানা প্রচার-প্রচারণা। কিন্তু বাস্তবে সরকারি খাদ্যগুদামে জমা পড়ছে না এক ছটাক গমও। নাটোরের বাগাতিপাড়ায় গত পাঁচ বছর ধরে এমনই চলছে সরকারি গম সংগ্রহ কার্যক্রম। সর্বশেষ ২০২১ সালের মে মাসে সরকারি গুদামে গম সংগ্রহ হয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হলেও তা পূরণ তো দূরের কথা, কোনো মৌসুমেই এক ছটাক গমও সংগ্রহ করতে পারেনি উপজেলা খাদ্য বিভাগ। চলতি মৌসুমেও ৯৩৬ মেট্রিক টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গত ৩ মে কার্যক্রম শুরু হয়। নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে ৩১ আগস্ট। সরকারি ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৩৬ টাকা। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ হয়েছে শূন্য। অথচ চলতি মৌসুমে বাগাতিপাড়ায় ৫ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৭৭১ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের হিসাবে প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ২১ হাজার ৬৮৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ গম উৎপাদন হলেও সরকারি খাদ্যগুদামে তার কোনো অংশই পৌঁছায়নি। কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি গুদামে গম না দেওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাজারদর ও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার পার্থক্য। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ গম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪৮০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। এতে সরকারি দামের তুলনায় মণপ্রতি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকেরা সরকারি গুদামের পরিবর্তে উন্মুক্ত বাজারেই গম বিক্রি করছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি গুদামে গম সরবরাহের নানা শর্ত। গুদামে গম দিতে হলে এর আর্দ্রতার মাত্রা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশের মধ্যে থাকতে হয়। অথচ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ১৮ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতার গমও কিনছেন। কৃষকদের ভাষ্য মতে , গুদামে গম নিয়ে গেলে পরিবহন ও কুলি খরচের পাশাপাশি পরিমাপ ও আর্দ্রতা যাচাইয়ের মতো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে মণপ্রতি আরও প্রায় ৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কৃষকের বাড়ি থেকেই গম কিনে নেওয়ায় এসব ঝামেলা ও বাড়তি খরচ থাকে না। যোগীপাড়া গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, সরকারি গুদামে গম দিতে গেলে নানা নিয়মকানুন ও ঝামেলা পোহাতে হয়। অনেক সময় গম নিয়ে গুদামে যাওয়ার পরও বিভিন্ন কারণে তা নেওয়া হয় না। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বাড়ি থেকেই গম কিনে নেন এবং দামও তুলনামূলক ভালো দেন। এ কারণে কৃষকেরা গুদামে গম দিতে আগ্রহ হারিয়েছেন। চকমহপুর গ্রামের কৃষক নাজিম উদ্দিন বলেন, গুদামে গম না দেওয়ার প্রধান কারণ দামের পার্থক্য। এর সঙ্গে পরিবহন ও কুলি খরচ, গমের আর্দ্রতা যাচাইসহ নানা ধরনের ঝামেলা রয়েছে। এসব কারণে কৃষকেরা বাজারেই গম বিক্রি করছেন। বাগাতিপাড়ায় গম উৎপাদনের চিত্রও সরকারি সংগ্রহব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখাচ্ছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগের মৌসুমে ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ১৫ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৯০ হেক্টরে। উৎপাদনও বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৬৮৯ মেট্রিক টন। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও সরকারি খাদ্যগুদামে গম সংগ্রহের চিত্র অপরিবর্তিতশূন্য। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত গম যেখানে ভালো দাম পাবেন, স্বাভাবিকভাবেই সেখানেই বিক্রি করবেন। চলতি বছর উপজেলায় গম উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা প্রায় পূরণ হয়েছে। কৃষকরা ভালো দাম পেলে সরকারি খাদ্যগুদামেও গম সরবরাহ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (চ. দা.) লাভলী খাতুন বলেন, সরকারিভাবে গম সংগ্রহের নির্দেশনা পাওয়ার পর কৃষকদের নিয়ে উপজেলা পরিষদে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে। মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমেও প্রচারণা চালানো হয়েছে। তবে সরকারি ক্রয়মূল্য বাজারদরের তুলনায় কম হওয়ায় কৃষকেরা গুদামে গম সরবরাহে আগ্রহী হচ্ছেন না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুল ইসলাম বলেন, তিনি নতুন যোগদান করায় বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন। তবে খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। ভবিষ্যতে কৃষকবান্ধব ব্যবস্থা ও বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করা হলে সরকারি খাদ্যগুদামে গম সরবরাহ বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দৈনিক রাজশাহীর শীর্ষ সংবাদ |